নারীদের পথচলার কিছু আদব

নারীদের পথচলার কিছু আদব post thumbnail image

নারীদের পথচলার কিছু আদব

১. হাঁটার সময় বিনয় ও লজ্জাশীলতা প্রদর্শন করা

আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَجَاءَتْهُ إِحْدَاهُمَا تَمْشِي عَلَى اسْتِحْيَاءٍ

অর্থ: “অতঃপর তাদের একজন লজ্জাশীলভাবে হেঁটে তার কাছে এল।”

এই আয়াত থেকে আলেমগণ বলেছেন— একজন নারীর চলাফেরা যেন লজ্জাশীলতা, বিনয় ও গাম্ভীর্যে ভরপুর হয়।

২. পথের মাঝ বরাবর হাঁটা থেকে বিরত থাকা

নারীরা রাস্তায় চলার সময় কখনোই রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলবে না। তারা রাস্তার এক পাশ দিয়ে চলবে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَيْسَ لِلنِّسَاءِ وَسَطُ الطَّرِيقِ»

অর্থ: “নারীদের জন্য রাস্তার মাঝ বরাবর হাঁটা বৈধ নয়।”-সহীহ ইবন হিব্বান, ৫৬০১।

অর্থাৎ, তাদের উচিত পথের পাশে হাঁটা, যাতে ফিতনার সম্ভাবনা না থাকে।

أبي أسيد الأنصاري عن أبيه أنه سمع رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول وهو خارج من المسجد،فاختلط الرجال مع النساء في الطريق فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم للنساء: ” استأخرن، فإنه ليس لكن أن تحققن الطريق، عليكن بحافات الطريق “.فكانت المرأة تلتصق بالجدار حتى إن ثوبها ليتعلق بالجدار من لصوقها به. أخرجه أبو داود (5272)

আবু উসাই আল আনছারী তার পিতা থেকে হাদিস বর্ণনা করেন, তিনি রাসূল সা. কে বলতে শুনেছেন, তিনি মসজিদের বাহিরে দেখতে পান যে, নারীরা রাস্তায় পুরুষের সাথে মিশে গেছেন। তখন আল্লাহর রাসূল নারীদের বলেন, তোমরা অপেক্ষা কর, কারণ, তোমাদের জন্য রাস্তার মাঝে হাটা উচিত নয়, তোমাদের জন্য হল রাস্তার পাশ। এ কথা শোনে নারী দেয়াল ঘেসে হাটা শুরু করে তখন দেখা গেল তাদের অনেকের কাপড় দেয়ালের সাথে মিশে যেত। -আবু দাউদ, হাদিস: ৫২৭২

৩. দৃষ্টি সংযত রাখা

আল্লাহ তাআলা নারীদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন:

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِن

অর্থ: “আর মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে।”-সূরা নূর।

তাই নারীর উচিত হাঁটার সময় অনর্থক এদিক-ওদিক তাকানো থেকে বিরত থাকা।

৪. তাবাররুজ (অলংকার প্রদর্শন) থেকে বিরত থাকা

নারীর রূপমাধুরী ও সৌন্দর্য লাবণ্য নারীর গর্ব।

তার এ রূপ-যৌবন সৃষ্টি হয়েছে একমাত্র কেবল তার স্বামীর জন্য। অন্য কারো জন্য নয়।

শরীয়তের সীমার মাঝে থেকে নারী যে কোনো প্রসাধন কেবল স্বামীর মন আকর্ষণের জন্য ব্যবহার করতে পারে। পরিধান করতে পারে যে কোনো পোশাক তার সামনে, কেবল তাকেই ভালো লাগানোর জন্য। এই সাজ-সজ্জাতেও লুকিয়ে থাকে ভালোবাসার রহস্য।

স্বামী ব্যতীত অন্য কারো জন্য অঙ্গসজ্জা করা ও তা প্রদর্শন করা বৈধ নয়।

তাই পরপুরুষের সামনে প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

﴿وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ

অর্থ: “আর তোমরা (নারীরা) প্রাচীন জাহিলিয়াতের যুগের মতো সাজ-সজ্জা প্রকাশ করে বের হয়ো না।”-সূরা আহযাব।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَا يُبۡدِينَ زِينَتَهُنَّ ۖ وَلَا يَضۡرِبۡنَ بِأَرۡجُلِهِنَّ لِيُعۡلَمَ مَا يُخۡفِينَ مِن زِينَتِهِنَّۚ﴾ [النور : ٣١]

“তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না, তারা যেন তাদের গোপন আভরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে—-

অর্থাৎ, নারীর সাজসজ্জা ও অলংকার প্রকাশ করে বাইরে বের হওয়া শারঈভাবে নিষিদ্ধ।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا، قَوْمٌ مَعَهُمْ سِيَاطٌ كَأَذْنَابِ الْبَقَرِ يَضْرِبُونَ بِهَا النَّاسَ، وَنِسَاءٌ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلَاتٌ مَائِلَاتٌ، رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ، لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ، وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا، وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَا»

“দুই শ্রেণীর মানুষ জাহান্নামের অধিবাসী যাদেরকে আমি দেখিনি, তারা ভবিষ্যতে আসবে প্রথম শ্রেণী অত্যাচারীর দল যাদের সঙ্গে থাকবে গরুর লেজের মত চাবুক যদ্ধারা তারা লোকদেরকে প্রহার করবে। আর দ্বিতীয় শ্রেণী হল সে নারীর দল যারা কাপড়তো পরিধান করবে কিন্তু তারা উলঙ্গ, নিজেরা অন্যদের প্রতি আকৃষ্ট এবং অন্যদেরকেও তাদের প্রতি আকৃষ্ট করবে, যাদের মস্তক [খোপা বাধার কারণে] উটের হেলে যাওয়া কুঁজের মত হবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। তার গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধ এত এত দূরবর্তী স্থান থেকেও পাওয়া যাবে”। -মুসলিম: ২১২৮।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

سَيَكُونُ فِي آخِرِ أُمَّتِي رِجَالٌ يَرْكَبُونَ عَلَى سُرُوجٍ، كَأَشْبَاهِ الرِّحَالِ، يَنْزِلُونَ عَلَى أَبْوَابِ الْمَسْجِدِ، نِسَاؤُهُمْ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ، عَلَى رُءُوسِهِمْ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْعِجَافِ، الْعَنُوهُنَّ، فَإِنَّهُنَّ مَلْعُونَاتٌ، “

“আমার শেষ জামানার উম্মতের মধ্যে কিছু এমন লোক হবে যারা ঘরের মত জিন (মোটর গাড়ি)তে সওয়ার হয়ে মসজিদের দরজায় দরজায় নামবে। (গাড়ি করে নামায পড়তে আসবে।) আর তাদের মহিলারা হবে অর্ধ নগ্না; যাদের মাথা কৃশ উঁটের কুঁজের মত (খোঁপা) হবে। তোমরা তাদেরকে অভিশাপ করো। কারণ, তারা অভিশপ্ত”।

৫. সুগন্ধি ব্যবহার না করা।

পোশাক আশাক ও শরীর যেন সুগন্ধিত বা সুরভিত না হয়।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«كُلُّ عَيْنٍ زَانِيَةٌ، وَالمَرْأَةُ إِذَا اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ بِالمَجْلِسِ فَهِيَ كَذَا وَكَذَا» يَعْنِي زَانِيَةً

“প্রত্যেক চক্ষুই ব্যভিচারী। আর নারী যদি সুগন্ধি ব্যবহার করে কোনো (পুরুষের) মজলিসের পাশ দিয়ে পার হয়ে যায় তাহলে সে এক বেশ্যা।” এমন কি এই অবস্থায় নামাযের জন্য যেতেও নিষিদ্ধ। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে মহিলা সেন্ট ব্যবহার করে মসজিদে যায়, সেই মহিলার গোসল না করা পর্যন্ত কোনো নামায কবুল হবে না”। -সহীহ আল-জামে আস-সগীর আযযিয়াদাতুহ: ২৭০

৬. হায়া ও গাম্ভীর্যের সাথে চলাফেরা

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«الْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الْإِيمَانِ»

অর্থ: “লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা।”-(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৩৫)

নারী যত বেশি হায়া ও গাম্ভীর্য নিয়ে চলবে, ততই তার ঈমানের পূর্ণতা প্রকাশ পাবে।

৭. অঙ্গসঞ্চালনে কোমলতা ও অপ্রদর্শন

আল্লাহ তাআলা নারীদের বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন:

فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ

অর্থ: “তোমরা (নারীরা) কণ্ঠে নরমভাব প্রকাশ করবে না, যাতে যার অন্তরে রোগ আছে সে লোভে পড়ে।”-সূরা আহযাব।

একইভাবে চলাফেরায়ও কোনো প্রকার প্রদর্শনী বা আকর্ষণীয় ভঙ্গি রাখা নিষিদ্ধ।

৮. ইজ্জত ও পবিত্রতা রক্ষা

আল্লাহ বলেন:

وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنّ

অর্থ: “আর তারা যেন তাদের সতীত্ব রক্ষা করে।”-সূরা নূর।

সুতরাং নারীর চলাফেরা সর্বদা পবিত্রতা ও চরিত্র রক্ষার ভিত্তিতে হতে হবে।

৯. পোশাক পর্দাবৃত ও শালীন হতে হবে।

পোশাক যেন সৌন্দর্যময় ও দৃষ্টি-আকর্ষণকারী না হয়।

এমনকি আবেদনময়ী চকচকে রঙিন বোরকাও পরা বৈধ নয়।

লেবাস যে বড় ফিতনাসৃষ্টিকারী ও হারাম তা বিভিন্ন লেডিস ড্রেসই সাক্ষ্য দেয়।

১০. পুরুষের সাদৃশ্য না হয়।

পোশাক আশাক ও চলাফেরা যেন পুরুষদের পোষাকের অনুরূপ না হয়।

প্যান্ট, শার্ট প্রভৃতি পোশাক কোনো মুসলিম মহিলা ব্যবহার করতে পারে না।

পুরুষদের বেশধারিণী নারীদের উপর আল্লাহর অভিশাপ থাকে।

রাসূল সা. বলেন,

«لَعَنَ الْمُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بِالنِّسَاءِ، وَلَعَنَ الْمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بِالرِّجَالِ»

“নারীদের বেশ ধারি পুরুষের উপর অভিশাপ এবং পুরুষদের বেশ ধারিণী নারীদের উপর আল্লাহর অভিশাপ”।

১১. অমুসলিমদের সাদৃশ্য না হয়।

পোশাক আশাক ও চলাফেরা যেন অমুসলিম মহিলাদের অনুরূপ না হয়।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« وَمَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ»

“যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরণ করবে, সে সেই জাতির দলভুক্ত”।

উপসংহার

নারীদের পথচলার আদব ইসলামে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত:

  1. বিনয়, লজ্জাশীলতা ও গাম্ভীর্য সহ হাঁটা।
  2. রাস্তার মাঝ বরাবর নয়, বরং পাশে হাঁটা।
  3. দৃষ্টি সংযত রাখা।
  4. আত্মপ্রদর্শন ও তাবাররুজ থেকে বিরত থাকা।
  5. হায়া ও পর্দা বজায় রাখা।
  6. চরিত্র, সতীত্ব ও ইজ্জত-আবরু রক্ষা করা।

Leave a Reply

Related Post

নসীব লিখিত, তবে কেন উদ্বেগ?নসীব লিখিত, তবে কেন উদ্বেগ?

“Stop stressing, when your ‘Naseeb’ is already written” 🖤 🖋 নসীব লিখিত – তবে কেন উদ্বেগ? ভূমিকা মানুষের জীবন নানা চাহিদা, প্রত্যাশা, অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তায় ভরা। ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, রিযিকের চিন্তা, সম্পর্কের

ইসলামে একাধিক বিয়ে: দায়িত্ব, বাস্তবতাইসলামে একাধিক বিয়ে: দায়িত্ব, বাস্তবতা

ইসলামে একাধিক বিয়ে: দায়িত্ব, বাস্তবতা বিয়ে (নিকাহ) ইসলাম ধর্মে শুধু ব্যক্তিগত ইচ্ছা পূরণের মাধ্যম নয়; বরং এটি একটি গুরু দায়িত্বপূর্ণ ইবাদত। এর মাধ্যমে পরিবার, বংশ, সমাজ এবং উম্মাহ গড়ে ওঠে।

ঘরের উন্নতি, জাদু-টোনা ও অন্যান্য অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য নিয়মিত পড়ুনঘরের উন্নতি, জাদু-টোনা ও অন্যান্য অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য নিয়মিত পড়ুন

#ঘরের উন্নতি, জাদু-টোনা ও অন্যান্য অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য #সূরা_বাকারা, #আয়াতুল_কুরসী, #সূরা_ফালাক, #সূরা_নাস নিয়মিত তিলাওয়াত করুন বা যারা তিলাওয়াত পারেন না তারা নিচের লিংক থেকে শুনুন, এবং ঘরের অন্য সদস্যদেরকে