বিবাহিত নারীর করণীয়: ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
ভূমিকা
ইসলামে বিয়ের মাধ্যমে একজন নারী ও পুরুষ একটি নতুন জীবন শুরু করেন, যা শুধু দাম্পত্য জীবনের সূচনা নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক, নৈতিক ও ধর্মীয় বন্ধনের সূচনা। কুরআন ও সুন্নাহ বিবাহিত নারীদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় ও দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে, যার মাধ্যমে তাদের সংসার সুখী ও জান্নাতের পথ হয়ে ওঠে।
১. স্বামীর প্রতি আনুগত্য ও সম্মান
বিয়ের পর একজন নারীর জন্য স্বামীর আনুগত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বামীর প্রতি সদাচরণ ও সহযোগিতা একটি সফল দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি।
হাদীস:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
“যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে, রমজানের রোজা রাখে, নিজের লজ্জাস্থান হেফাযত করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
(মুসনাদে আহমদ: হাদীস ১৬৬১)
২. ইবাদত ও ব্যক্তিগত নেক আমল বজায় রাখা
বিবাহিত নারী হওয়া সত্ত্বেও নামাজ, রোযা, কুরআন তিলাওয়াত ও জিকির-আজকারে মনোযোগী থাকা উচিত। এটি পারিবারিক পরিবেশেও বরকত আনে।
আল-কুরআন:
“আর আমি জিন ও মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্য।”
(সূরা আদ-যারিয়াত: ৫৬)
৩. পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করা
বিবাহিত নারী হওয়ার পরও একজন নারীর দায়িত্ব হয় নিজের পর্দা ও চরিত্র সংরক্ষণ করা, যেন পরিবার ও সমাজে শুদ্ধতা বজায় থাকে।
আল-কুরআন:
“হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন নিজেদের উপর চাদরের কিছু অংশ টেনে নেয়।”
(সূরা আহযাব: ৫৯)
৪. সংসার পরিচালনা ও সন্তানের তালীম তারবিয়ত (শিক্ষা-দীক্ষা)
একজন বিবাহিত নারীর বড় দায়িত্ব হলো ঘর গুছিয়ে রাখা ও সন্তানদের ইসলামি শিক্ষায় বড় করা।
হাদীস:
রাসূল (সা.) বলেন:
“তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল, আর তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। একজন নারী তার স্বামীর ঘরে ও সন্তানের ওপর দায়িত্বশীল।”
(বুখারী: ৮৯৩, মুসলিম: ১৮২৯)
৫. ভালো ব্যবহার ও দাম্পত্য সম্পর্ক রক্ষা
স্বামীর সঙ্গে উত্তম আচরণ, ভালোবাসা, সহনশীলতা ও ক্ষমাশীলতা বিবাহিত জীবনের মূলভিত্তি।
আল-কুরআন:
“তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে উত্তম আচরণ কর।”
(সূরা আন-নিসা: ১৯)
৬. স্বামীর সম্পদের হেফাযত ও আমানত রক্ষা
স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার সম্পদ, সম্মান এবং পরিবারের হেফাযত করা নারীর দায়িত্ব।
আল-কুরআন:
“নেককার নারীরা হয় অনুগত, এবং আল্লাহ যা হেফাযত করার নির্দেশ দিয়েছেন, তারা তা হেফাযত করে স্বামীর অনুপস্থিতিতে।”
(সূরা আন-নিসা: ৩৪)
৭. সময় ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা
অপচয় না করে গৃহস্থালির খরচ ও সময় পরিচালনায় দক্ষতা একজন আদর্শ গৃহিণীর গুণ।
হাদীস:
রাসূল (সা.) বলেন:
“আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।”
(সুনানে নাসায়ী, হাদীস: ৪৬৯৫)
৮. স্বামীকে ইসলামের পথে উৎসাহিত করা
যদি স্বামী কোন ভুল কাজে লিপ্ত হয়, স্ত্রী যেন তাকে নম্রভাবে ইসলামের পথে ফেরাতে চেষ্টা করে। এটি ইমানদার স্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
উপসংহার
বিবাহিত নারীর জন্য ইসলাম যেসব করণীয় নির্ধারণ করেছে, তা শুধু দায়িত্ব নয়; বরং প্রতিটি কাজেই রয়েছে নেকী, কল্যাণ ও জান্নাতের দরজা। একটি পরিবার গঠন, সন্তানদের ইসলামি জীবন দান, স্বামীর সহচর্য এবং নিজ জীবনের পূর্ণতা—সবই এই করণীয়গুলোর মাধ্যমে অর্জিত হয়।
তথ্যসূত্র (References):
- আল-কুরআন (সূরা আন-নিসা, সূরা আহযাব, সূরা আন-নূর, সূরা আদ-যারিয়াত)
- সহীহ বুখারী, হাদীস: ৮৯৩
- সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৮২৯
- মুসনাদে আহমদ, হাদীস: ১৬৬১
- সুনানে নাসায়ী, হাদীস: ৪৬৯৫
- তাফসীর ইবনে কাসীর
আল্লহ তাআলা আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন আমীন।
