তাকওয়া অর্জনের উপায়

তাকওয়া অর্জনের উপায় post thumbnail image

তাকওয়া হাসিলের তরীকা

আল্লাহর কথা স্মরণ রেখে, পরকালের শাস্তির ভয় মনে জাগরুক রেখে শরিয়তের হুকুম মেনে চলাই হলো তাকওয়া। এই তাকওয়া হাসিল করবো কীভাবে? কলবে আল্লাহর ভয় জাগ্রত হবে কীভাবে?

প্রথম তরীকা,
আল্লাহর আযাব-গজবের কথা বেশি বেশি স্মরণ করা। জাহান্নামের শাস্তির কথা কুরআনে আছে। বিভিন্ন হাদীসে আছে পরকালের বিবরণ। এসংক্রান্ত আয়াত ও হাদীস বারবার পড়া। এই শাস্তি ও আযাব আমি আপনি বরদাশত করতে পারব না। এটা স্মরণ করলে আল্লাহর আযাবের ভয় অন্তরে পয়দা হবে। আখেরাতের ফিকির পয়দা হবে।

দ্বিতীয় তরিকা,
মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করা। নবীজি হাদীস শরীফে বলেছেন,

أكثروا هاذم اللذات

স্বাদ কর্তনকারী মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ কর।

মৃত্যুর কথা আমাদের স্মরণেই থাকে না। এত অহংকার, এত দাপট, এত ক্ষমতা, এত টাকা, আমি যে মরব তা স্মরণ নেই। আমার চোখের সামনে কত মানুষ মরছে। প্রতিদিন কত মানুষের মৃত্যুর ঘোষণা হচ্ছে। কিন্তু আমি যে মরবো, একথা স্মরণে থাকে না।

মৃত্যুকে স্মরণ করা মানে মওত-মওত জপা নয়। মৃত্যুকে স্মরণ করার অর্থ, মাঝে মধ্যে এ-কথা ধ্যান করা যে, আমার বড়রা চলে গেছে। যারা একসময় এই ঘরে বসবাস করতো, তারা এই পথে হেঁটেছে, এই এলাকায় বিচরণ করেছে, তারা চলে গেছে। যে কোন মূহুর্তে আমাকেও যেতে হবে। মনকে বোঝানো, যে কোন মূহুর্তে চলে যেতে হবে। সময় বলে দেওয়া নেই, বয়সও নেই।

মাঝে মাঝে ধ্যান করা, আমার মৃত্যু হয়েছে, ছেলে মেয়ে আমার জন্য কাঁদছে। আমাকে গোসল দিচ্ছে। কাফন পরাচ্ছে। আমাকে খাটে ওঠানো হচ্ছে, জানাযা হচ্ছে। আমাকে কবরে রাখা হচ্ছে। এসব কথা চিন্তা করা। বেশি না, দুই এক মিনিট। সকালে করেন, বিকেলে শোয়ার আগে চিন্তা করেন। দেখবেন, চব্বিশ ঘন্টা ঠিক হয়ে যাবে। জীবন নিয়ন্ত্রণে এসে যাবে।

তো মৃত্যুকে স্মরণ করলে তাকওয়া পয়দা হবে। আল্লাহর ভয় অন্তরে জাগ্রত হবে।

হযরত থানবী রহ. বলেন, মৃত্যুর কথা ধ্যান করলে যদি আতংক বোধ হয়, টেনশন চলে আসে, তাহলে জান্নাতের নায-নেয়ামত স্মরণ করবে।

তৃতীয় তরীকা:
প্রতিদিন শোয়ার আগে, বিছানায় গিয়ে দুই তিন মিনিটে চব্বিশ ঘন্টার হিসাব নেন। এটাকে আরবীতে বলে মুহাসাবা। খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত ওমরে ফারুক রা. বলেন:

حاسبوا قبل أن تحاسبوا
আল্লাহর দরবারে পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে। ঐ হিসাব দেয়ার আগে নিজেই নিজের হিসাব কর। ঘাটতি থাকলে ক্ষতিপূরণ কর।

আল্লাহ তাআলা আলো-অন্ধকার, ভিতর-বাহির সব জানেন। আল্লাহকে ফাঁকি দেয়া যায় না। এটা চিন্তা করে দৈনিক নিজের আমলের হিসাব কর। আমি কয়টা নেক আমল করলাম আর কয়টা বদ আমল করলাম। যে ব্যক্তি আসল হিসেবের আগে দুনিয়াতে নিজের হিসাব নিজে নিবে, তার জন্য আল্লাহর দরবারে হিসাব দেয়া সহজ হবে।

প্রতিদিন শোয়ার সময় বিছানায় গিয়ে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে হিসাব করিÑ আজ চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে, আমি কি কি নেক আমল করেছি। নেক আমলগুলো চিন্তা করে আলহামদুলিল্লাহ বলি। আজ পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়েছি। আল্লাহ তেলাওয়াত করার তাওফিক দান করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাসবীহ পড়ার তাওফিক দান করেছেন। আল্লাহ আমাকে দান করার তাওফিক দিয়েছেন। দ্বীনী ইলম হাসিল করার তাওফিক দান করেছেন, হালালভাবে রোজগার করার তাওফিক দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ। অহংকার নয়, আল্লাহর শোকর আদায় করি।

আর যদি কোন গুনাহ হয়ে থাকে, ঘুমানোর আগে তওবা করি। আল্লাহ! আমার দ্বারা এই গুনাহ হয়ে গেছে, চোখের গুনাহ হয়ে গেছে, মুখের গুনাহ হয়ে গেছে, হাতের গুনাহ হয়ে গেছে, আল্লাহ! তোমার কাছে মাফ চাই, আমি তাওবা করছি, আগামীতে আর করব না।

এইভাবে তাওবা করে ঘুমান। যে ব্যাক্তি শোয়ার আগে এমন হিসাব প্রতিদিন করবে, ইনশাআল্লাহ আগামি চব্বিশ ঘন্টা তার সুন্দর যাবে এবং তার অন্তরে আল্লাহর ভয় পয়দা হবে।

চতুর্থ তরিকা,
প্রতিদিন ফজর নামাজ পড়ে দুই মিনিট আল্লাহর সাথে ওয়াদা করি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আল্লাহ! আমি আপনার বান্দা, আপনার গোলাম। আপনি আমার মালিক, আমার মাওলা। আজ আমি কোন গুনাহ করব না। কোন নফরমানি করব না। আপনি আমাকে এই ওয়াদা রক্ষা করার তাওফিক দান করেন।

মুখে বলার দরকার নেই, মনে মনে ওয়াদা করেন। গাড়ীতে বসে বসে করেন। আল্লাহ! মেহেরবানি করে আমাকে রক্ষা করেন।

আল্লাহ তো আরহামুর রাহিমীন। যে বান্দা আল্লাহর সাথে ওয়াদা করে এবং চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে গুনাহ থেকে হেফাজত করেন। অন্তরে তাকওয়া দান করেন।

পঁঞ্চম তরিকা,
যার অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে, যার দৈনন্দিন জীবনে তাকওয়া-পরহেযগারি আছে,

إذا ذكرالله وجلت قلوبهم

আল্লাহর বড়াই-আযমত স্মরণ করে যাদের অন্তর কেঁপে ওঠে, যাদের দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, এমন আল্লাহওয়ালাদের সোহবতে যাও। তাদের সঙ্গে থাক। তাদেরকে মহব্বত কর। তাদের বয়ান শোন। তাদের নসীহত শোন। তাদের অনুসরণ কর। তাদের কিতাব পড়। তাদের পরামর্শ মত জীবনযাপন কর। তাহলে তাকওয়া অর্জিত হবে।

ঐ আল্লাহওয়ালা বুযুর্গের অন্তরে যে তাকওয়া আছে, খোদাভীতির গুণ আছে, তার সোহবতের বদৌলতে আল্লাহ তাআলা তাকওয়ার গুণ আপনার অন্তরে পয়দা করে দিবেন। ঐ বুযুর্গের কথা শুনতে শুনতে, বয়ান শুনতে শুনতে, তাকে মহব্বত করার কারণে তার তাকওয়ার গুণ, চেতনে-অবচেতনে আল্লাহ তাআলা আপনাকেও দিয়ে দিবেন।

ছষ্ঠ তরিকা:
আল্লাহ রব্বুল আলামীনের দরবারে দোয়া করা। পাঁচওয়াক্ত নমাযের পর এবং শেষ রাতে দোয়া করা। তাকওয়া সম্পর্কিত নবীজীর শেখানো দোয়াগুলো পাঠ করা।

اللهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى، وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى

হে আল্লাহ! আমাকে হেদায়েত দাও, তাকওয়া নসিব করো। সচ্চরিত্র ও সচ্ছলতা দান করো। Ñসহীহ মুসলিম

اللَّهُمَّ اقْسِمْ لَنَا مِنْ خَشْيَتِكَ مَا يَحُولُ بَيْنَنَا وَبَيْنَ مَعَاصِيكَ، وَمِنْ طَاعَتِكَ مَا تُبَلِّغُنَا بِهِ جَنَّتَكَ، وَمِنَ اليَقِينِ مَا تُهَوِّنُ بِهِ عَلَيْنَا مُصِيبَاتِ الدُّنْيَا، وَمَتِّعْنَا بِأَسْمَاعِنَا وَأَبْصَارِنَا وَقُوَّتِنَا مَا أَحْيَيْتَنَا، وَاجْعَلْهُ الوَارِثَ مِنَّا، وَاجْعَلْ ثَأْرَنَا عَلَى مَنْ ظَلَمَنَا، وَانْصُرْنَا عَلَى مَنْ عَادَانَا، وَلاَ تَجْعَلْ مُصِيبَتَنَا فِي دِينِنَا، وَلاَ تَجْعَلِ الدُّنْيَا أَكْبَرَ هَمِّنَا وَلاَ مَبْلَغَ عِلْمِنَا، وَلاَ تُسَلِّطْ عَلَيْنَا مَنْ لاَ يَرْحَمُنَا.

হে আল্লাহ! আমার ভাগ্যে তোমার এতটুকু ভয় নসিব করো, যা তোমার নাফরমানি থেকে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, এতটুকু নেকআমলের তাওফিক দাও, যার উসিলায় আমি তোমার জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছতে পারি। এতটুকু ঈমানি দৃঢ়তা দান করো, দুনিয়ার সমস্ত মুসিবত যেন তুচ্ছ হয়ে যায়। যত দিন হায়াতে রাখোÑ শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও কর্মক্ষমতা বহাল রেখো। শত্রুর বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো। আমাদেরকে দ্বীনী বিষয়ে বিপদে ফেলো না। দুনিয়াকে আমাদের সবচে বড় ভাবনার বিষয় বানিয়ো না, আমাদের বিদ্যাবুদ্ধি দুনিয়াবি বিষয়ে সীমাবদ্ধ করে দিও না। বেরহম কাউকে আমাদের উপর কর্তৃত্ব দিও না।Ñসুনানে তিরমিজি

اللهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا، وَزَكِّهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا، أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلَاهَا، اللهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ، وَمِنْ قَلْبٍ لَا يَخْشَعُ، وَمِنْ نَفْسٍ لَا تَشْبَعُ، وَمِنْ دَعْوَةٍ لَا يُسْتَجَابُ لَهَا

আয় মাওলা! আমার অন্তরে তাকওয়া নসিব করো। আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে দাও। তুমিই সর্বোত্তম পরিশোধনকারী। তুমিই তার মালিক ও অভিভাবক। তোমার কাছে অনোপকারী বিদ্যা হতে পানাহ চাই, ভয়ভক্তিহীন অন্তর থেকে পানাহ চাই, আরও পানাহ চাই অতৃপ্ত বাসনা থেকে। এমন দোয়া থেকেও পানাহ চাই, যা কবুল হওয়ার নয়।Ñসহীহ মুসলিম

তাকওয়া অর্জনের জন্য এই ছয় তরীকা আমরা গ্রহণ করি। তাহলে আমাদের তাকওয়ার জিন্দেগি নসিব হবে ইনশাআল্লাহ।

তাকওয়া হলো পূর্ণাঙ্গ দ্বীন। যে মুত্তাকী সে পূর্ণ দ্বীনদার, ঈমানদার। প্রত্যেকটা অঙ্গ-প্রত্যেঙ্গের তাকওয়া আছে। চোখের তাকওয়া চোখকে গুনাহ থেকে হেফাজত করা। কানের তাকওয়া, কানকে গুনাহ থেকে হেফাজত করা। যবানের তাকওয়া, যবানকে গুনাহের কথা থেকে হেফাজত করা। হাতের তাকওয়া হাতকে গুনাহ থেকে হেফাজত করা। পায়ের তাকওয়া পাকে গুনাহ থেকে হেফাজত করা। পেটের তাকওয়া হারাম খাওয়া থেকে বিরত থাকা। দিল-দেমাগ এর তাকওয়া হলো, দিল-দেমাগকে গুনাহের কল্পনা থেকে হেফাজত করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আমল করার তাওফিক দান করুন, আমীন।

-মাওলানা আবু সাবের আব্দুল্লাহ

Leave a Reply

Related Post

রুহানিয়াতের দৈন্যরুহানিয়াতের দৈন্য

📌 বর্তমান সময়ের দ্বীনদারদের সবচেয়ে বড় সমস্যা: “রুহানিয়াতের দৈন্য” ❝قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا ﴿٩﴾ وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا﴿١٠﴾❞ “যে নিজ আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে সে সফলকাম হয়েছে। আর যে আত্মাকে কলুষিত

নসীব লিখিত, তবে কেন উদ্বেগ?নসীব লিখিত, তবে কেন উদ্বেগ?

“Stop stressing, when your ‘Naseeb’ is already written” 🖤 🖋 নসীব লিখিত – তবে কেন উদ্বেগ? ভূমিকা মানুষের জীবন নানা চাহিদা, প্রত্যাশা, অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তায় ভরা। ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, রিযিকের চিন্তা, সম্পর্কের