📌 বর্তমান সময়ের দ্বীনদারদের সবচেয়ে বড় সমস্যা: “রুহানিয়াতের দৈন্য”
❝قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا ﴿٩﴾ وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا﴿١٠﴾❞
“যে নিজ আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে সে সফলকাম হয়েছে। আর যে আত্মাকে কলুষিত করেছে সে ব্যর্থ হয়েছে।”
— (সূরা আশ-শামস: ৯-১০)
🔸 ১. ডিভাইসপ্রেম বনাম মসজিদপ্রেম
আজ আমাদের সম্পর্ক যতটা না মসজিদের সাথে, তার চেয়েও বেশি মোবাইল-ডিভাইসের সাথে। মসজিদের নীরবতা, তাকবীরের ধ্বনি, ও তিলাওয়াতের প্রশান্তি হারিয়ে যাচ্ছে স্ক্রলের শব্দে, স্ক্রিনের আলোয়।
🔹 হাদীস:
❝وما اجتمع قومٌ في بيتٍ من بيوتِ اللهِ، يتلونَ كتابَ اللهِ، ويتدارسونه بينهم، إلا نزلتْ عليهم السكينةُ، وغشيتهم الرحمةُ، وحفَّتهم الملائكةُ، وذكرهم اللهُ فيمَن عنده❞
“যে কওম আল্লাহর ঘরে একত্রিত হয়ে কুরআন তিলাওয়াত ও আলোচনা করে, তাদের উপর নেমে আসে প্রশান্তি, রহমত ঘিরে ফেলে, ফেরেশতা তাদের পরিবেষ্টন করে এবং আল্লাহ তাদের নিজের কাছে স্মরণ করেন।”
— (মুসলিম: ২৬৯৯)
🔸 ২. কাজের চেয়ে বেশি প্রচারণা — আর তাতে সততার অভাব
দ্বীনি কাজ যতটা করা হয়, তার চেয়ে বেশি ব্যস্ততা থাকে তা প্রচারে। ফলে, কাজের তুলনায় প্রচারের ছবিতে অতিরঞ্জন দেখা দেয়। “ইখলাস” কমে যায়, “রিয়া” ঢুকে পড়ে।
🔹 হাদীস:
❝مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللهُ بِهِ، وَمَنْ يُرَائِي يُرَائِي اللهُ بِهِ❞
“যে লোক লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে আমল করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা লোকদের সামনে প্রকাশ করে দিবেন।”
— (বুখারী: ৬৪৯৯)
🔸 ৩. নিজের আত্মশুদ্ধির চেয়ে অন্যের সংশোধনে ব্যস্ততা
অন্যের ভুল ধরার চিন্তায় আমরা যতটা ব্যস্ত, নিজের ত্রুটি ধরার চেষ্টায় ততটা মনোযোগ নেই। নিজে কতটা বদলাচ্ছি, সেই হিসাব নেই।
🔹 আল্লাহ বলেন:
❝يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ❞
“হে মুমিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বলো যা তোমরা করো না?”
— (সূরা আস-সাফ: ২)
🔸 ৪. যোগ্যতা অর্জনের আগেই কাজ শুরু
প্রয়োজনীয় তাযকিয়া ও ইলম ছাড়া দ্বীনের কাজ হাতে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে, খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি হচ্ছে।
🔹 হাদীস:
❝العلمُ قبل القولِ والعملِ❞
“কথা বলার ও আমল করার আগে ইলম অপরিহার্য।”
— (বুখারী, মুকাদ্দিমা)
🔸 ৫. নির্জনতা অপ্রিয় হয়ে পড়া
আল্লাহওয়ালাদের সংস্পর্শ, নির্জনতায় যিকর, ইবাদত— সবই আজ অবহেলিত। অথচ এই একাকীত্বে লুকিয়ে আছে রুহানিয়াতের চাবিকাঠি।
🔹 হাদীস:
❝سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ… وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ❞
“সাত শ্রেণির মানুষ কিয়ামতের দিন আরশের ছায়া পাবে… তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে, সে একাকী আল্লাহকে স্মরণ করে ও কেঁদে ফেলে।”
— (বুখারী: ১৪২৩)
🔸 ৬. ব্যক্তিগত আমলের অবহেলা
জামাত ছুটে যাচ্ছে, ফজর কাজা হচ্ছে, কিছুতেই অনুশোচনা আসছে না। দুনিয়াবি কাজের ঝড়ে ইবাদত হয়েছে চাপে-পড়া কাজ!
🔹 কুরআন:
❝فَوَيْلٌ لِلْمُصَلِّينَ، الَّذِينَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ❞
“অতএব দুর্ভোগ সেই নামাযীদের জন্য, যারা তাদের নামাযে গাফেল।”
— (সূরা মাউন: ৪-৫)
🔸 ৭. আত্মসমালোচনার অনুপস্থিতি
মুহাসাবা, মুআআখাযা, মুরাকাবার মতো আত্মশুদ্ধির কৌশলগুলো আজ বিলুপ্তপ্রায়। বাইরের চাকচিক্যে ভেতরের গাফেলি চাপা পড়ে গেছে।
🔹 উমর (রাঃ) বলতেন:
❝حَاسِبُوا أَنفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا❞
“তোমরা হিসাব চাওয়ার আগে নিজেকে হিসাব করো।”
🔸 ৮. তাহাজ্জুদের নির্জনতা আর প্রিয় লাগে না
রাত্রির কান্না, চোখের অশ্রু, অনুশোচনার ব্যথা— সবই যেন হারিয়ে গেছে তাজা দুনিয়াবি ব্যস্ততায়।
🔹 কুরআন:
❝كَانُوا قَلِيلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ، وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ❞
“তারা রাতে অল্পই ঘুমাত, আর শেষ রাতে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।”
— (সূরা যারিয়াত: ১৭-১৮)
📢 শেষ কথা:
আজ আমাদের প্রয়োজন আত্মিক জাগরণ, ইখলাসের নবায়ন এবং রুহানিয়াতের পুনর্জাগরণ।
আমলকে প্রচারের চেয়ে আল্লাহর সামনে পেশ করার চিন্তা করতে হবে।
নিজের জন্য সময় বের করতে হবে, কুরআনের আয়নায় নিজের মন পরখ করতে হবে।
🌙 একটি দো‘আ:
❝اللّٰهُمَّ أَصْلِحْنَا بَاطِنًا وَظَاهِرًا، وَارْزُقْنَا لَذَّةَ الذِّكْرِ، وَدَمْعَةَ الْخَشْيَةِ، وَقَلْبًا مُخْبِتًا، وَنَفْسًا لَوَّامَةً.❞
“হে আল্লাহ! আমাদের ভেতর ও বাহির ঠিক করে দিন। যিকরের স্বাদ দিন, ভয়ের অশ্রু দিন, নম্র হৃদয় দিন, তিরস্কারকারী আত্মা দিন।”আমীন
