দ্বীনি মাদরাসাগুলো আমাদের পরিচয়: আমরা এই পরিচয়কে ধ্বংস হতে দিব না
—আমিরুল হিন্দ মাওলানা সাইয়েদ আরশাদ মাদানী
মাদরাসা থেকেই সর্বপ্রথম ইংরেজদের দাসত্ব: মুক্তির আওয়াজ উঠেছিল। মাদরাসাগুলো আমাদের দ্বীন; দুনিয়া নয়। মাদরাসায় আমরা দ্বীন অন্বেষন করি, দুনিয়া নয়। মাদরাসাগুলো আমাদের পরিচয়, কোন ভাবেই এদেরকে নিশ্চিহ্ন হতে দিব না— গত ১ জুন রবিবার আজমগড়ের সারায়ে মীরে অনুষ্ঠিত ‘তাহাফফুজে মাদারিস কনফারেন্সে’ এমন বক্তব্য রাখেন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি, আমিরুল হিন্দ মাওলানা সাইয়েদ আরশাদ মাদানী দা.বা.।
তিনি বলেন—এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন।
এ সম্মেলন উদ্ভুত আশংকাজনক পরিস্থিতিতে, মাদরাসাগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সহনশীলতার সাথে চিন্তা-গবেষণা করে ভবিষ্যতে কার্যকরী কর্মসূচী প্রণয়নের জন্য আয়োজন করা হয়েছে। মাদরাসাগুলোর উদ্দেশ্য শুধু কিতাবী জ্ঞানার্জনে নয়, এখানে দেশ ও জাতির সেবা করার জন্য বাচ্চাদেরকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়। আজ যে মাদরাসাগুলোকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে জোরপূর্বক বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে, এগুলো সেই মাদরাসা যার থেকে সর্বপ্রথম ইংরেজদের দাসত্ব থেকে মুক্তির আওয়াজ উঠেছিল।
মাওলানা আরশাদ মাদানী বলেন— দুঃখজনক বিষয়, আজ যারা ক্ষমতাশীন তারা পড়তে এবং জানতে আগ্রহী নয় বরং তারা ইতিহাসকে বিকৃত করে তাতে সাম্প্রদায়িক ছাপ তৈরি করছে। এমন ব্যক্তিদেরকে আমরা বলব, ১৮০৩ সালে যখন দেশ পুরোপুরি ইংরেজদের দখলে চলে যায়। তখন দিল্লির এক মহান ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব শাহ আব্দুল আজীজ দেহলবী রহ. তাঁর রহিমিয়া মাদরাসার একখানা ছেড়া চাটাইয়ে বসে ঘোষণা দেন,—”দেশ পরাধীন হয়ে গেছে, এখন দেশকে মুক্ত করার জন্য জিহাদ করা ফরজ।” এ ঘোষণার পরে তাঁর মাদরাসাকে গুড়িয়ে দেয়া হয় এবং তাঁর উপর শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন। এটা ইতিহাস; একে অস্বীকার করা যাবে না।
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের ইতিহাসের দিতে তাকান, যার কারণে শুধু দিল্লিতেই ৩২ হাজার আলেমকে হত্যা করা হয় এবং ইংরেজরা তাদেরকে গাদ্দার উপাধী দেয়। আত্মোৎস্বর্গের ফিরিস্তি এখানেই থেমে থাকেনি। আমাদের পূর্ববর্তী আকাবির ও আসলাফদের ১৫০ বছরের অক্লান্ত চেষ্টা প্রচেষ্টার পর এই দেশ স্বাধীন হয়। আমি আজ একথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করছি- দারুল উলূম দেওবন্দ এই লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল যে, সেখান থেকে দেশের পক্ষে সংগ্রাম করার জন্য নতুন যোদ্ধা তৈরি করা হবে। যদি বিশ্বাস না হয় ইতিহাসের বই খুলে দেখুন।
মাওলানা মাদানী আরো বলেন—ইতিহাসের অজ্ঞরা আজ ওই সকল মাদরাসাকে সন্ত্রাসবাদের আখড়া বলে। তাদের অভিযোগ, মাদরাসায় মৌলবাদী শিক্ষা দেয়া হয়। উত্তর প্রদেশ থেকে উত্তরখণ্ড, আসাম থেকে হারিয়ানা পর্যন্ত যত মাদরাসা মসজিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা হচ্ছে তা সবই ধর্মের ভিত্তিতে। এখন প্রশ্ন আসে যেখানে আইন প্রত্যেক নাগরিককে সমান অধিকার ও সুযোগ দিয়ে থাকে তাহলে গণতান্ত্রিক ও সেকুলার রাষ্ট্রে এই বৈষম্য এবং অবিচার কেন? তার উত্তর খুবই সরল—ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য একটি বিশেষ দলের তত্তাবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করা হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার ষড়যন্ত্র করছে।
তিনি বলেন—এটা একটি সেকুলার রাষ্ট্র (ভারত), তাই ধর্মের উপর ভিত্তি করে কোন বিশেষ গোষ্ঠির সাথে অন্যায় অবিচারের সুযোগ নেই। কিন্তু আফসোস, তিক্ত হলেও সত্য, আজ এক বিশেষ গোষ্ঠিকে ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা করে তাকে এ কথা গেলানো হচ্ছে যে, তার সকল নাগরিক অধিকার নিষিদ্ধ। মাওলানা মাদানী বলেন, অবস্থা যতই নির্মম হোক আমাদের হতাশ হওয়া যাবে না বরং এ সকল পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয় প্রত্যয়, সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সাথে।
জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ আযাদীর পূর্বে এবং পরে দেশে শান্তি, ঐক্য এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টার সাথে সাথে সব ধরণের নিপীড়ন, বৈষম্য ও জুলুম নির্যানের বিরুদ্ধে অনবরত কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতেও সর্ব শক্তি দিয়ে করে যাবে। আমদের লড়াই সরকারের সাথে, সাধারণ জনগণের সাথে নয়। ইসলামী মাদরাসাগুলো মুসলমানদের মূল চালিকা শক্তি আর এমন ঘৃণ্য কাজ করে আমাদের ধমনী কর্তন করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। অবৈধ বলে মাদরাসাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা সুপ্রিম কোর্টের রায়ের অবমানার নামান্তর।
জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ—এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে পুনরায় আইনি লড়াই শুরু করেছে। কারণ মাদরাসার সুরক্ষিত হলে দ্বীন সংরক্ষণ হবে। তিনি মাদরাসার দায়িত্বশীলদের সাহস যুগিয়ে বলেন, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ আপনাদের পাশে আছে। আপনাদের সকল ধরণের সাহায্য এবং আইনী সহযোগীতা করা হবে। এছাড়াও জমিয়তে উলামা উত্তর প্রদেশের পক্ষ থেকে আর্কিটেক্ট প্যানেল গঠন করা হয়েছে। যারা মসজিদ এবং মাদরাসা নির্মানের নকশার অনুমোদন ইত্যাদি সমস্যায় আপনাদের সাহায্য করবে।
জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের আইনজীবি প্যানেল আগে থেকেই আছে। যারা হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত শত শত মামলা মুকাদ্দামা লড়ছে। মাওলানা মাদানী মাদরাসার দায়িত্বশীলদের এই পরামর্শও দেন মাদরাসা এবং মসজিদ নির্মাণের পূর্বে এটা দেখে নেওয়াও অত্যন্ত জরুরী, যে ভূমিতে নির্মাণ করা হবে সে ভূমি কোন ধরণের। তিনি বলেন, আমাদের মাদরাসা মসজিদের জন্য অন্যের সাহায্যে প্রয়োজন নেই। আমরা এ কথাকে দৃঢ়ভাবে মনে গেঁথে নেই নতুন মাদরাসা ও মসজিদ নির্মানের জন্য নিজের জমিকে নির্বাচন করব। উত্তম হবে ওই জমিকে মাদরাসা এবং মসজিদের নামে ওয়াকফ বা দান করে দেয়া।
তিনি বক্তব্যের শেষে বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি আমাদেরকে সতর্ক করেছে এতে আতঙ্কিত এবং হতাশ হাওয়ার প্রয়োজন নেই বরং এমতাবস্থায় আইনী এবং গণতান্ত্রিক লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। আল্লাহ আমাদের রক্ষা এবং সাহায্যকারী।
পয়গাম ২৪ থেকে সংগৃহিত ।
