দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর প্রতি নসীহত
– ফকীহুল আসর, মুফতিয়ে আজম, ইমামে রাব্বানী, হযরত মুফতী রশীদ আহমদ (রহঃ)
যতক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ তাকওয়া (আল্লাহভীতি ও ধর্মনিষ্ঠতা) অর্জিত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত দাম্পত্য সম্পর্ক সুদৃঢ় করার যত চেষ্টা-ই করা হোক না কেন, সবই ব্যর্থ হয়ে যায়।
স্বামীর উচিত হলো—
স্ত্রীর সঙ্গে ভালোবাসা ও সদ্ভাব সৃষ্টি করার চেষ্টা করা,
নিজের ভেতর উত্তম চরিত্র ও তাকওয়া গড়ে তোলা,
নৈতিকতার উৎকর্ষতা অর্জন করা,
ভালোবাসার প্রকাশ করা
এবং নিয়মিত দোয়া করা।
কোনো কথায় স্ত্রীর প্রতি তিরস্কার ও তাচ্ছিল্য প্রকাশ করা মোটেই উচিত নয়।
স্ত্রীকে বুঝিয়ে বলা দরকার যে,
কোনো অভিযোগ বা কষ্ট থাকলে সেটা পিতা-মাতা কিংবা অন্যান্য আত্মীয়স্বজনদের বলবে না।
কারণ তারা সেটা অতিরঞ্জিত করে বলবে, এতে ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা আরও বেড়ে যাবে। বরং যা কিছু বলার বা অভিযোগ করার থাকলে সেটা সরাসরি স্বামীকেই জানাবে। অন্যদের বললে উভয় পক্ষের মাঝে ঘৃণা ও দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
স্ত্রী-স্বামী পরস্পরের প্রশংসা এবং সদ্গুণ আত্মীয়স্বজনদের সামনে বর্ণনা করবে।
স্ত্রীর কর্তব্য হলো—
স্বামীর আন্তরিকভাবে খিদমত করা (সেবা করা),
শরীয়তের সীমার মধ্যে থেকে স্বামীর আনুগত্য করা।
শরীয়তের পরিপন্থী কোনো আদেশ বা চাহিদা পালন করা বৈধ নয়।
স্ত্রী যেন স্বামীকে অধিক উপার্জনের লোভে একটা বোঝাবাহক গাধার মতো পরিণত না করে, বরং সাধাসিধে জীবন ও কনআতের (তুষ্টি) জীবনযাপনকে অবলম্বন করে। এতে পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে এবং জীবনে সুখ-শান্তি ও পরিতৃপ্তি আসবে।
– নির্বাচিত মালফুজাত জাওহারে রশীদ (৭/৯)
زوجین کو نصیحت
جب تک پورا تقویٰ نہ ہو ازدواجی تعلقات استوار رکھنے کی جتنی کوششیں کی جائیں سب بے سود رہتی ہے۔ شوہر کو چاہئے کہ بیوی سے محبت کے ساتھ توافق پیدا کرنے کی کوشش کرے اپنے اندر اخلاق اور تقویٰ پیدا کرے، اخلاق کی بلندی، اظہار محبت اور دعاء کرے، کسی بات پر طعنہ ہر گز نہ دے، بیوی کو سمجھائے کہ کوئی شکایت ہو تو والدین اور دوسرے عزیزوں کو نہ بتائے وہ آگے اور بڑھا چڑھا کر کہیں گے اس سے فتنہ بڑھے گا جو شکایت اور تکلیف ہو وہ مجھے بتائیں دوسروں کو بتانے سے جانبین میں نفرت اور بُعد پیدا ہو گا۔ والدین اور دوسرے رشتہ داروں کے ہاں ایک دوسرے کی تعریف کیا کریں۔ بیوی شوہر کی خوب خدمت کرے، شریعت کی حدود میں رہتے ہوئے اس کی اطاعت کرے، شریعت کے خلاف کسی کی اطاعت جائز نہیں، شوہر کو زیادہ سے زیادہ مال کمانے کی ہوس میں خرکار کا گدھا بنانے کی کوشش نہ کرے بلکہ سادگی اور قناعت اختیار کرے، اس سے جانبین میں محبت بڑھے گی اور پر کیف زندگی حاصل ہوگی۔
فقیہ العصر مفتی اعظم امام ربانی حضرت مفتی رشید احمد صاحب رحمہ اللہ تعالیٰ –
سلسلہ منتخب ملفوظات جواہر الرشید 7/9
দাম্পত্য জীবনে তাকওয়া ও পরস্পরের হক আদায়ের গুরুত্ব — ইসলামী নির্দেশনা ও হযরত মুফতী রশীদ আহমদ রহ. এর মালফূযাতের আলোকে
ভূমিকা:
দাম্পত্য জীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও পারস্পরিক দায়িত্বশীলতার সম্পর্ক। এটি কেবল শারীরিক বা সামাজিক সম্পর্ক নয়; বরং আত্মিক প্রশান্তি, সহযোগিতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির একটি পথ। ইসলামী শরীয়ত স্বামী ও স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি কী দায়িত্ব রয়েছে, কীভাবে জীবনযাপন করতে হবে—তা পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করেছে। এই প্রবন্ধে আমরা হযরত মুফতী রশীদ আহমদ (রহ.)-এর মালফূযাত “زوجین کو نصیحت” এর আলোকে কুরআন ও হাদীসের দলীলসহ বিস্তারিত আলোচনা করব।
প্রথম অধ্যায়: তাকওয়া ছাড়া দাম্পত্য জীবন অস্থিতিশীল
মালফূযাত:
“جب تک پورا تقویٰ نہ ہو ازدواجی تعلقات استوار رکھنے کی جتنی کوششیں کی جائیں سب بے سود رہتی ہے۔”
ব্যাখ্যা ও দলীল:
তাকওয়া হলো আল্লাহভীতি, যার দ্বারা একজন ব্যক্তি নিজের আচরণে শালীনতা, দায়িত্ববোধ ও পরস্পরের হক আদায়ের প্রবণতা গড়ে তোলে।
🕌 কুরআন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا، يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্য কথা বলো। তিনি তোমাদের কাজগুলোকে সুশৃঙ্খল করবেন…”
— সূরা আহযাব: ৭০-৭১
🤲 হাদীস:
اتقِ اللهَ حيثُما كنتَ
“তুমি যেখানে থাকো, আল্লাহকে ভয় কর।”
— (তিরমিযী, হাদীস: ১৯৮৭)
বিশ্লেষণ:
যে পরিবারে তাকওয়া অনুপস্থিত, সেখানে হিংসা, অবিশ্বাস, অহংকার ও পরস্পরের অবহেলা বাড়ে। পক্ষান্তরে তাকওয়া একটি পরিবারের মধ্যে ভয়, দায়িত্ববোধ এবং সহমর্মিতা সৃষ্টি করে।
দ্বিতীয় অধ্যায়: স্বামীর করণীয় — ভালোবাসা, ধৈর্য ও সদাচরণ
মালফূযাত:
“شوہر کو چاہئے کہ بیوی سے محبت کے ساتھ توافق پیدا کرنے کی کوشش کرے… اظہار محبت اور دعاء کرے، کسی بات پر طعنہ ہر گز نہ دے۔”
দলীল ও ব্যাখ্যা:
🕌 কুরআন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“তোমরা স্ত্রীদের সাথে সঙ্গত আচরণে বসবাস কর।”
— সূরা নিসা: ১৯
🕋 নবীজি ﷺ এর আদর্শ:
“خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي”
“তোমাদের মধ্যে উত্তম সে, যে তার পরিবারে উত্তম। আমিই তোমাদের মধ্যে পরিবারের জন্য সবচেয়ে উত্তম।”
— (তিরমিযী, হাদীস: ৩৮৯৫)
🤲 নসীহত:
স্ত্রীর সাথে সদাচরণ, প্রশান্তি, ভালোবাসার ভাষা, দোয়ার অভ্যাস—এসবই হৃদয় গলিয়ে দেয়। অপরদিকে তিরস্কার, গালি, দুর্ব্যবহার সংসারকে বিষাক্ত করে তোলে।
তৃতীয় অধ্যায়: অভিযোগ পেশের শালীনতা ও রক্ষণশীলতা
মালফূযাত:
“بیوی کو سمجھائے کہ کوئی شکایت ہو تو والدین اور دوسرے عزیزوں کو نہ بتائے… اس سے فتنہ بڑھے گا۔”
দলীল ও শিক্ষা:
🕌 কুরআন:
إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ
“নিশ্চয় কিছু ধারণাও গোনাহ।”
— সূরা হুজুরাত: ১২
🤝 শরঈ নীতি:
পরিবারের ভেতরের সমস্যাগুলো বাইরে প্রচার করলে গীবত, তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ, অহংকার ও বিবাদ বাড়ে।
📚 ইবনে আবিদ্দুনিয়া বলেন:
“الستر علی الأهل من خصال المؤمنين”
“পরিবারের ত্রুটি গোপন রাখা মুমিনদের বৈশিষ্ট্য।”
চতুর্থ অধ্যায়: স্ত্রীর দায়িত্ব — খিদমত, আনুগত্য ও পরহেজগারি
মালফূযাত:
“بیوی شوہر کی خوب خدمت کرے، شریعت کی حدود میں رہتے ہوئے اس کی اطاعت کرے…”
দলীল ও ব্যাখ্যা:
🕌 কুরআন:
فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِّلْغَيْبِ
“সদ্বীপ্তা নারীরা হয় অনুগত এবং পেছনে (স্বামী অনুপস্থিত থাকলে) নিজের পবিত্রতা রক্ষা করে।”
— সূরা নিসা: ৩৪
🕋 হাদীস:
إذا صلت المرأة خمسَها، وصامت شهرَها، وأطاعت زوجَها، قيل لها: ادخلي الجنةَ من أيِّ أبوابِها شئتِ
“যদি কোনো নারী পাঁচ ওয়াক্ত সালাত পড়ে, রমজানের রোজা রাখে এবং স্বামীর আনুগত্য করে—তাহলে তাকে বলা হবে, ‘তুমি জান্নাতে প্রবেশ করো যেকোনো দরজা দিয়ে চাও।’”
— (মুসনাদে আহমদ, হাদীস: ১৬৬১)
পঞ্চম অধ্যায়: দুনিয়াবি লোভ ও বাস্তবতার ভারসাম্য
মালফূযাত:
“شوہر کو زیادہ سے زیادہ مال کمانے کی ہوس میں خرکار کا گدھا بنانے کی کوشش نہ کرے بلکہ سادگی اور قناعت اختیار کرے…”
দলীল ও বিশ্লেষণ:
🕌 কুরআন:
وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَىٰ مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ
“তোমার চোখ অন্যদের ভোগ-বিলাসের দিকে প্রসারিত করো না।”
— সূরা তোহা: ১৩১
📚 ইমাম গাযযালী রহ. বলেন:
“القناعة كنز لا يفنى”
“তুষ্টি এক অপূর্ব ধন, যা কখনো শেষ হয় না।”
উপসংহার:
দাম্পত্য জীবনের স্থায়িত্ব, শান্তি এবং হৃদ্যতা তখনই সম্ভব, যখন উভয় পক্ষ তাকওয়াপূর্ণ জীবনযাপন করে, পারস্পরিক দায়িত্ব পালন করে এবং শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন না করে।
হযরত মুফতী রশীদ আহমদ (রহ.)-এর উক্ত পয়গাম আমাদের আধুনিক পরিবার ব্যবস্থার জন্য এক অনন্য পথনির্দেশ।
আসুন, আমরা তাকওয়াপূর্ণ পরিবার গড়ে তুলি।
পরস্পরের হক আদায় করি।
আমাদের স্ত্রী ও স্বামীকে আল্লাহর রাহে সহযাত্রী বানাই।
🤲 দোয়া:
اللَّهُمَّ اجْعَلْ بُيُوتَنَا بُيُوتَ السَّكِينَةِ وَالْمَحَبَّةِ وَالتَّقْوَى
“হে আল্লাহ! আমাদের ঘরগুলোকে শান্তি, ভালোবাসা ও তাকওয়ার কেন্দ্র বানিয়ে দাও।”
