মায়ের দায়িত্ব ও কর্তব্য

মায়ের দায়িত্ব ও কর্তব্য post thumbnail image

 


মায়ের দায়িত্ব ও কর্তব্য

ভূমিকা

ইসলামে মায়ের মর্যাদা এমন এক উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত, যা অন্য কোনো সম্পর্ককে দেওয়া হয়নি।

একজন মা শুধু একটি সন্তানের জন্মদাত্রীই নন, বরং একজন মুমিনের চরিত্র গঠনের প্রাথমিক শিক্ষক।

তার দায়িত্ব ও কর্তব্য শুধুমাত্র গর্ভধারণ বা সন্তান জন্মদান নয়, বরং তার লালন-পালন, শিক্ষা-দীক্ষা ও নৈতিকতার ভিত্তি স্থাপন।


১. সন্তানের জন্মদানে ধৈর্য ও কষ্ট সহ্য করা

আল্লাহ তাআলা মাতৃত্বের কষ্ট ও ধৈর্যকে স্মরণ করে বলেছেন:

আল-কুরআন:
“আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে এবং দু’বছরে তার দুধ ছাড়ানো হয়েছে। আমাকে ও তোমার পিতা-মাতাকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো। আমারই দিকে প্রত্যাবর্তন।”
(সূরা লুকমান: ১৪)

তাফসীর:
ইবনে কাসীর বলেন, এই আয়াতে মাতৃত্বকালীন কষ্টকে স্বীকৃতি দিয়ে আল্লাহ সন্তানকে মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।


২. দুধ পান করানো ও সন্তানের যত্ন নেওয়া

মা হওয়ার প্রথম বড় দায়িত্ব হলো দুধ পান করানো। এর মাধ্যমে শুধু পুষ্টিই নয়, ভালোবাসা ও নিরাপত্তাবোধ জন্মায়।

আল-কুরআন:
“মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে।”
(সূরা আল-বাকারা: ২৩৩)


৩. সন্তানের ইসলামি শিক্ষা-দীক্ষা ও নৈতিক চরিত্র গঠন

মা-ই সন্তানের প্রথম মাদ্রাসা।

নবী করীম (সা.) বলেছেন:

হাদীস:
“প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে। তারপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদি, নাসারা বা অগ্নিপূজক বানিয়ে ফেলে।”
(সহীহ মুসলিম: হাদীস ২৬৫৮)

ব্যাখ্যা:
মায়ের নিকট শিশুর প্রথম শিক্ষা গ্রহণ ঘটে। সুতরাং, একজন নেককার মা-ই পারে সন্তানকে সৎ ও আল্লাহভীরু বানাতে।


৪. সন্তানদের দোয়ায় শামিল হওয়া ও তাওহিদ শেখানো

সন্তান যেন আল্লাহর ইবাদত করে—এ জন্য একজন মা তার হৃদয়ে দোয়া ও উপদেশ রেখে চলে।

আল-কুরআন:
ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়া—
“হে আমার রব! আমাকে ও আমার সন্তানদের নামায কায়েমকারী বানাও।”
(সূরা ইবরাহীম: ৪০)


৫. উত্তম আদব-আখলাক শেখানো

সন্তানের ব্যক্তিত্ব গঠনে মা’র ভূমিকা অপরিসীম। মা যদি শিষ্টাচার শেখান, তা সন্তানের জীবনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে।

হাদীস:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
“তোমাদের মধ্যে উত্তম হল সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবার পরিজনের কাছে উত্তম।”
(তিরমিজি: ৩৮৯৫)


৬. সন্তানের জন্য উপার্জনের ফিতনায় না পড়ে, গৃহকেন্দ্রিক পালন

ইসলামে নারীদের গৃহকেন্দ্রিক জীবনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সন্তানদের সময় দেওয়াই হলো মায়ের মূল ভূমিকা।

আল-কুরআন:
“তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো…”
(সূরা আত-তাহরীম: ৬)


৭. ইবাদত ও দীনদার মায়ের প্রভাব

একজন মা নিজের ইবাদত ও তাকওয়ার মাধ্যমে সন্তানের হৃদয়ে আল্লাহর ভয় ও প্রেম প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

হাদীস:
নবী (সা.) বলেন,
“যে সন্তান রেখে যায়, তার জন্য সদকায়ে জারিয়া চলমান থাকে।”
(সহীহ মুসলিম: ১৬৩১)


৮. কন্যা সন্তানকে আদর ও ইসলামীভাবে গড়ে তোলা

হাদীস:
“যে ব্যক্তি দুটি কন্যাকে যত্নসহকারে বড় করবে, সে জান্নাতে আমার সঙ্গে থাকবে।”
(সহীহ মুসলিম: ২৬৩১)


৯. সন্তানের প্রতি দয়া ও ক্ষমাশীলতা

নবী করীম (সা.) মায়েদের উদাহরণ দিয়ে সন্তানের প্রতি দয়ার বিষয়টি বোঝাতেন।

হাদীস:
এক মহিলাকে তার বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে দেখে রাসূল (সা.) সাহাবিদের বললেন,
“তোমরা কি মনে করো, এই মা তার সন্তানকে আগুনে নিক্ষেপ করবে?” তারা বলল, “না।” তিনি বললেন,
“আল্লাহ তার বান্দার প্রতি এর চেয়ে অনেক বেশি দয়ালু।”

(সহীহ বুখারী: ৫৯৯৯)


উপসংহার

একজন মা ইসলামের দৃষ্টিতে শুধুই একজন নারী নন, বরং জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাতা।

তার দায়িত্ব কেবল গর্ভধারণ বা দুধ পান করানো নয়, বরং সে তার সন্তানের ঈমান, আমল, আখলাক ও ভবিষ্যৎ গঠনের প্রধান কারিগর।

ইসলামের দেওয়া নির্দেশনায় চললে একজন মা জান্নাতের পথিক হতে পারেন।


তথ্যসূত্র (References):

  1. আল-কুরআন: সূরা লুকমান: ১৪; সূরা বাকারা: ২৩৩; সূরা আহযাব: ৩৩; সূরা তাহরীম: ৬
  2. সহীহ বুখারী: হাদীস ৫৯৯৯
  3. সহীহ মুসলিম: হাদীস ১৬৩১, ২৬৫৮, ২৬৩১
  4. সুনানে তিরমিজি: হাদীস ৩৮৯৫
  5. তাফসীর ইবনে কাসীর

আল্লহ তাআলা আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন আমীন।

Leave a Reply

Related Post

দুনিয়াতেও সেরা, আখিরাতেও সেরা।দুনিয়াতেও সেরা, আখিরাতেও সেরা।

দুনিয়াতেও সেরা, আখিরাতেও সেরা! দুনিয়াতে সেরা হওয়া আর আখিরাতে সফল হওয়ার মধ্যে কোনও স্বাভাবিক সংঘাত নেই—বরং আল্লাহর বিধান মেনে, আখিরাতের হিসাব ঠিক রেখে দুনিয়াতে সেরা হলে, সেটাই আখিরাতেও উন্নতির পথ

ইসলামে একাধিক বিয়ে: দায়িত্ব, বাস্তবতাইসলামে একাধিক বিয়ে: দায়িত্ব, বাস্তবতা

ইসলামে একাধিক বিয়ে: দায়িত্ব, বাস্তবতা বিয়ে (নিকাহ) ইসলাম ধর্মে শুধু ব্যক্তিগত ইচ্ছা পূরণের মাধ্যম নয়; বরং এটি একটি গুরু দায়িত্বপূর্ণ ইবাদত। এর মাধ্যমে পরিবার, বংশ, সমাজ এবং উম্মাহ গড়ে ওঠে।

দ্বীনে অটল থাকার জন্য ছোট কর্ম-তালিকাদ্বীনে অটল থাকার জন্য ছোট কর্ম-তালিকা

দ্বীনে অটল থাকার জন্য ছোট কর্ম-তালিকা এই আমলগুলো প্রতিদিনের আমলের লিস্টে রাখুন। ১. আউয়াল ওয়াক্তে নামাজ ২. নামাজ কি শুদ্ধ হচ্ছে/ নামাজে কি মনযোগী হতে পেরেছি? ৩. কুরআন শুদ্ধ করা