জান্নাতের বিনিময়ে দুনিয়া বিক্রি

জান্নাতের বিনিময়ে দুনিয়া বিক্রি

রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবীগণ (রা.) জান্নাতের নেয়ামতের তুলনায় দুনিয়ার সম্পদকে তুচ্ছ মনে করতেন।

অথচ আমরা জান্নাতের বিবরণ শুনি আর আমলের তোয়াক্কা না করে বিনা পরিশ্রমেই সোজা জান্নাতী হতে চাই; দুনিয়ার সম্পদের মোহ ত্যাগ করতে চাই না।
.
দেখুন,

আবু দাহদাহ (রা.) কী করেছেন :

মদীনার বাগানগুলোর মধ্যে এক ইয়াতীম ছেলের একটি বাগান ছিল। তার বাগানের সাথে লাগোয়া বাগানের মালিক ছিলেন আবু লুবাবা নামের এক লোক। সেই ইয়াতীম ছেলেটি নিজের বাগান বরাবর একটি প্রাচীর দিতে গিয়ে দেখল, প্রতিবেশীর একটি খেজুর গাছ সীমানার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। ছেলেটি তার প্রতিবেশীর কাছে গিয়ে সমস্যার কথা বলে সীমানার খেজুর গাছটি কিনতে চাইলো যাতে প্রাচীরটি সোজা হয়। কিন্তু প্রতিবেশী আবু লুবাবা কোনভাবেই রাজী হচ্ছিল না।

কোন উপায় না পেয়ে সেই ইয়াতীম রাসুলুল্লাহ্ ﷺ এর কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা বুঝিয়ে বললো।

আল্লাহর রাসুল ﷺ ডেকে পাঠালেন আবু লুবাবাকে। সে মসজিদে নববীতে আসলে নবী করীম ﷺ সেই খেজুর গাছটি অর্থের বিনিময়ে হলেও ইয়াতীম ছেলেটিকে দিয়ে দিতে অনুরোধ করলেন।

আবু লুবাবা যথারীতি রাজী হলো না। রাসুলুল্লাহ্ ﷺ এক পর্যায়ে তাকে বললেন, “তোমার ভাইকে ওই খেজুর গাছটি দিয়ে দাও। আমি তোমার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছের জিম্মাদার হব।”

বিস্ময়কর হলেও আবু লুবাবা তারপরেও সেই খেজুর গাছ দিতে রাজী হলো না। রাসুলুল্লাহ্ ﷺ এই পর্যায়ে চুপ হয়ে গেলেন। এর চেয়ে বেশী তিনি ﷺ তাকে আর কী বলতে পারেন!

উপস্থিত সাহাবীদের মধ্যে সাবিত (রাঃ)ও ছিলেন। তিনি আবু দাহদাহ নামে পরিচিত ছিলেন। মদীনায় তাঁর খুব সুন্দর একটি বাগান ছিল। প্রায় ৬০০ খেজুর গাছ ছাড়াও একটি মনোরম বাড়ি ও একটি পানির কুয়া ছিল সেখানে। মদীনার সব বড় ব্যবসায়ীদের কাছে আবু দাহদাহ (রাঃ) এর বাগানটি সুপরিচিত ছিল। তিনি স্বপরিবারে সেখানে বসবাসও করতেন।

আবু দাহদাহ (রাঃ) হঠাৎ রাসুলুল্লাহ্ ﷺ -এর কাছে গিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহ্’র রাসুল ﷺ ! আমি যদি আবু লুবাবার কাছ থেকে ঐ খেজুর গাছটি কিনে এই ইয়াতীমকে দিয়ে দেই, তাহলে আমিও কি জান্নাতে একটি খেজুর গাছের মালিক হবো?’ রাসুলুল্লাহ্ ﷺ বললেন, “হ্যাঁ, তোমার জন্যও জান্নাতে খেজুর গাছ থাকবে।” আবু দাহদাহ (রাঃ) সাথে সাথে আবু লুবাবাকে বললেন, ‘আপনি আমার সেই সম্পূর্ণ বাগানটি গ্রহণ করে সেই খেজুর গাছটি আমাকে দিয়ে দিন।’

আবু লুবাবা ‘দুনিয়াবী’ এই বিনিময় বিশ্বাস করতে পারছিল না! হুঁশ ফিরলেই সে বলল, ‘হ্যাঁ আমি আপনার খেজুর গাছের বাগানটি গ্রহণ করলাম। বিনিময়ে আমার সেই খেজুর গাছটি আপনাকে দিয়ে দিলাম।’

হযরত আবু দাহদাহ (রাঃ) সেই মূহুর্তেই খেজুর গাছটি ইয়াতীম ছেলেটিকে উপহার হিসাবে দিয়ে দিলেন। তারপর রাসুলুল্লাহ্ ﷺ এর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হে রাসুলুল্লাহ্ ﷺ ! এখন আমি কি জান্নাতে একটি খেজুর গাছের মালিক হলাম’? রাসুলুল্লাহ্ ﷺ বললেন, “আবু দাহদাহ’র জন্য জান্নাতে এখন কত বিশাল বিশাল খেজুরের বাগান অপেক্ষা করছে।”

বর্ণনাকারী হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, এ কথাটি রাসুলুল্লাহ্ ﷺ এক, দুই বা তিনবার বলেননি; বরং খুশী হয়ে বারবার বলেছেন।

শেষে আবু দাহদাহ (রাঃ) সেখান থেকে বের হয়ে সদ্য বিক্রি করে দেয়া সেই বাগানে ফিরে গেলেন। বাড়ির দরজায় এসে স্ত্রীকে ডাক দিলেন তিনি, ‘হে উম্মে দাহদাহ! বাচ্চাদেরকে নিয়ে এ বাগান থেকে বের হয়ে আসো। আমি দুনিয়ার এই বাগান বিক্রি করে দিয়েছি’। তাঁর স্ত্রী বললেন, ‘আপনি কার কাছে এটি বিক্রি করেছেন? কে কত দাম দিয়ে এটি কিনে নিয়েছে?’

আবু দাহদাহ (রাঃ) বললেন, ‘আমি জান্নাতে একটি খেজুর বাগানের বিনিময়ে তা বিক্রি করে দিয়েছি’। তাঁর স্ত্রী বললেন, ‘আল্লাহু আকবার! হে আবু দাহদাহ! আপনি অবশ্যই অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা করেছেন’।

[মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১২৫০৪; ইবনে হীব্বান, হাদীস ৭১৫৯; আস-সিলসিলা সাহীহাহ, হাদীস ২৯৬৪; মুস্তাদরাকে হাকীম, হাদীস ২১৯৪]

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই স্পিরিট দান করুন। আমিন।

সংগৃহিত।

Leave a Reply

Related Post

শিশুদের হাতে মোবাইল দেওয়ার মারাত্মক ক্ষতিশিশুদের হাতে মোবাইল দেওয়ার মারাত্মক ক্ষতি

শিশুদের হাতে মোবাইল দেওয়ার মারাত্মক ক্ষতি রয়েছে। আসুন, আমরা ক্ষতিগুলোর দিকে এক নজর দিই— ১. মস্তিষ্কের বিকাশে ব্যাঘাত: এই বয়সে শিশুদের মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হয়। বেশি স্ক্রিন টাইম শিশুর শেখার

দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর প্রতি নসীহতদাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর প্রতি নসীহত

দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর প্রতি নসীহত – ফকীহুল আসর, মুফতিয়ে আজম, ইমামে রাব্বানী, হযরত মুফতী রশীদ আহমদ (রহঃ) যতক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ তাকওয়া (আল্লাহভীতি ও ধর্মনিষ্ঠতা) অর্জিত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত দাম্পত্য

আগে নিজেকে ঠিক করো, পরে বিশ্বকে!আগে নিজেকে ঠিক করো, পরে বিশ্বকে!

🌿 আগে নিজেকে ঠিক করো, পরে বিশ্বকে! সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি একজন মানুষের হৃদয় থেকে শান্তি কেড়ে নেয়, তা হলো—এই ভুল ধারণা যে তার ওপর দায়িত্ব পড়েছে গোটা পৃথিবীকে সংশোধন